কথা সত্য মতলব খারাপ
 
লেখক ও বই সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু কথাঃ-
 
মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দিনকে বাংলাদেশের পাঠকমহলে পরিচয় করিয়ে দেয়ার নতুন করে অবকাশ রাখে না। বিশেষ করে “আহকামে জিন্দেগী”র লেখক হিসেবে অনেকেই চিনে থাকেন। উনার আরো কিছু বই হলো ফিকহুন নেছা, ফাযায়েলে জিন্দেগী, আহকামে হজ্জ, ইসলামী আক্বীদা ও ভ্রান্ত আক্বীদা, ইসলামী মনোবিজ্ঞান, কুর’আন হাদিছ ও ইসলামী ইতিহাসের মানচিত্র, ভাষা ও সাহিত্য প্রশিক্ষনদাওয়াত ও তাবলীগের মূলনীতি ইত্যাদি।
 
“কথা সত্য মতলব খারাপ” বইটিতে কিছু কথা ও পরিভাষার শাব্দিক রূপ , অর্থ, প্রকৃত অর্থ ও পরিভাষা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যেগুলো শুনতে অনেক শ্রুতিমধুর কিন্তু তাঁর প্রয়োগ করা হয় উল্টোটা । যেমন বলা যায় প্রগতিশীল ,মুক্তমনা , ফ্রি মাইন্ডেড পারসন ইত্যাদি নানা রকমের গালভরা কথার সত্যিকার অর্থে সুন্দর ও শ্রুতিমধুর উত্তর আছে , কিন্তু এইসব কথার পরিভাষার ব্যাবহারের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখি তার সম্পুর্ণ উল্টো কান্ড।এই বিষয় গুলো খুবি রসালোভাবে ও রম্য আকারে লেখক তুলে ধরেছেন।
 
মুল পাঠ্যালোচনাঃ-
 
প্রথমেই বলবো ইসলামিক ক্যাটাগরির বই ও সত্যিকারের বাস্তব রম্যগল্প আকারের; এমন বই আমার খুব-ই কম চোখে পড়েছে। লেখকের বিশেষত্ব ও মুন্সিয়ানা এখানেই বলে মনে করি। সত্যিকারের কথা রম্য আকারে লেখক নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই বইয়ে।
প্রথমেই অবতরনিকা অধ্যায়ে লেখক হযরত আলি (রাঃ) এর একটা কথা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন, কথাটি হলো-“কালিমাতু হাক্কিন উরিদা বিহাল বাতিল” অর্থাৎ কথাটি সত্য তবে মতলব খারাপ। একথাটি খারেজীদের সম্পর্কে বলেন খলিফাতুল মুসলেমিন আলী (রাঃ) , কারন খারেজীরা আলী রাঃ ও আমীরে মুয়াবিয়া রাঃ এর খিলাফতকে অস্বীকার করে শ্লোগান দিত-“ইনিল হুকমু ইন্না লিল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারো নির্দেশ চলতে পারেনা। যদিও কথাটা কুর’আনের একটা আয়াত , তারপরো দুরদর্শী ও বিচক্ষন আলী (রাঃ) তদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে এ কথা বলেছেন যে তাদের কথা ঠিক হলেও তাদের মতলব খারাপ। ভাল কথার পিছনেও যে খারাপ উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকতে পারে ও বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত ছড়ানো যায় তা আমরা আলী (রাঃ) এর কথায় দেখতে পারি। কারন প্রতারণা ও মিথ্যা কথায় মানুষকে পটানোর চেয়ে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর বলে খারাপ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অনেকেই এই ধরনের কথা ব্যাবহার করে।
.
ঠিক তেমনি হাল যুগে এমন কিছু কথা শুনা যায়,যা শুনলে আমাদের কাছে মনে হয় , আরে এই কথা তো ঠিকিই আছে , এখানে এত প্যাঁচ ধরার কি আছে! কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগক্ষেত্রে দেখা যায় এই সব কথা সত্যিকারের ও প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। এইসব গালভরা শব্দ উচ্চারণের ও ব্যাবহারের মাধ্যমে মানুষকে মানসিকভাবে ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়ার একটা হীন প্রচেষ্টা থাকে। এর ফলাফল কিন্তু মারাত্মক ,আমরা সত্যিকে সত্যি বলে ভালোভাবে জানতে পারি না , আমাদের চিন্তা চেতনা বলে আমরা ঠিক আছি , কিন্তু দেখা যায় ফলাফল উল্টো। তাই আমাদের এই ধরনের কথা ও শব্দের ব্যাবহার হতে সাবধান থাকতে হবে।
 
যেসব কথার ধাঁধাঁর মাধ্যমে সুন্দর শব্দের জাল বুনে মানুষের মনকে ধোকা দেয়া হয় তা লেখক একটা একটা করে চ্যাপ্টারে বর্ণনা করেছেন। আসুন আমরা এবার বিষয়বস্তুগুলো দেখে নিই-
 
– মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তমন,
– ফ্রি মাইন্ড,
– চিত্ত বিনোদন,
– প্রগতি, যুগের হাওয়া ও যুগধর্ম,
– নারীমুক্তি ও নারী স্বাধীনতা,
– মৌলবাদী , প্রতিক্রিয়াশীল , সেকেলে, মধ্যযুগীয়,ধর্মান্ধ,কুপমন্ডুক ইত্যাদি,
– গনতন্ত্র,
– গনতান্ত্রিক অধিকার,
– ব্যাক্তি স্বাধীনতা, ধর্মনিরেপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়ীকতা,
– সমাজসেবা ,
– শিল্প সংষ্কৃতি,
– লীলাখেলা ও
– যুক্তি,
 
এসব সুন্দর, সুরুচীপুর্ণ ও শ্লীল শব্দের প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ সম্পর্কে এই কিতাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই শব্দগুলো বর্তমানে বেশি করে কথিত বুদ্ধিজীবীদের মুখে ও প্রগতিশীল সুশীল দের মুখে বেশি শুনা যায়। এই শব্দগুলোর শাব্দিক অর্থ , প্রকৃতপক্ষে কি ও কোন ধরণের অর্থে ও উদ্দেশ্য বহন করে তা নিয়ে আলোচনা করা আছে, কিন্তু আমরা বর্তমানে সমাজের নষ্ট হাওয়ার গা ভাসিয়ে দিয়ে এই শব্দগুলোর অর্থ কি কি দেখি তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
 
উদাহরণস্বরূপ, লেখক বলেন ফ্রি মাইন্ড কথাটির বাংলা অর্থ হলো “মুক্তমন”, বলা বাহুল্য ব্যাবহারিক জীবনে এই কথাটির গুরুত্ব অপরিসীম এর মানে হলো একে অন্যের প্রতি কোন ধরণের কু’ধারনা থাকবে না, কলুষতা ও আবিলতামুক্ত অকপট বিশ্বাসে ভরা থাকবে মন, সহজ সরল হৃদয়ে একে অন্যের কথা , কাজ ও আচরনকে গ্রহন করবে থাকবে না কোন ধরণের শঠতা, ভন্ডামি ও জড়তাপুর্ণ কোন মানসিকতা। কিন্তু আমরা আধুনিক ও আধুনিকারা এই কথাকে বেশ বড় একটা শুভঙ্করের ফাঁকি হিসেবে গ্রহণ করে থাকি। বর্তমানে এরা নৈতিক অনুশাসন থেকে দূরে সরে মুক্তমন বা ফ্রি মাইন্ডকে, ফ্রি সেক্স হিসেবে গ্রহণ করেছে। ব্যাপারটা এমন যেন কেউ নৈতিকভাবে যদি অনুশাসনমুক্ত না হয় তাহলে সে যেন মুক্তমনা না ।
 
আরেকটা সুন্দর উদাহরন দিয়েছেন “চিত্তবিনোদন” কথাটির অর্থে , এখানে চিত্তবিনোদন মানে হলো মনের বা চিত্তের আনন্দের জন্য আমরা যা করে থাকি , কিন্তু এই ক্ষেত্রে একটা বড় শুভঙ্করের ফাঁকি হলো এই কথাটিকে আমরা শরীয়তের গন্ডির বাইরে নিয়ে গিয়ে যেমন তেমন অর্থ করে যেমন তেমন হারাম বিনোদনের উপকরন বানিয়ে ফেলি। যুগের হাওয়া, ও প্রগতির উদাহরনে লেখক বলেন, প্রগতি অভিধানিক অর্থে ঠিক হলেও এটার মতলব খুব-ই খারাপ।আর “যুগের হাওয়ার” কথা বলে যে আমাদের আধুনিক ও তরুন সমাজ কতটুকু বিভ্রান্ত হচ্ছে তাঁর ইয়ত্তা নেই ।
 
মৌলবাদী , প্রতিক্রিয়াশীল ,সেকেলে, মধ্যযুগীয়, ধর্মান্ধ, কুপমন্ডুক শব্দের ব্যাখা দিতে গিয়ে বলেন যে মোল্লা, মৌলভীদের তথকথিত আধুনিকরা এসব কথা বলে মজা পান , এগুলো নাকি ভদ্র ভাষার গালি । আর এভাবে গালি দেইয়া নাকি একটা “ডিপ্লোমেটিক টেকনিক”। আভিধানিক ও তাত্বিক দিক থেকে কথাগুলো যদিও সত্য মনে হয় , কিন্তু তাঁর মতলব খারাপ। শেষে দুটো মজার অধ্যায় সংযুক্ত করা হয়েছে একটা হলো “লীলাখেলা” আরেকটি “যুক্তি”। লীলাখেলাতে লেখক পীরের নামে ভন্ড বাবারা কিভাবে মানূষকে ধোকা দেয় আর তারা নিজেদের পক্ষে কোন কোন যুক্তি উপস্থাপন করেন তাও রম্যকারে উপস্থাপন করেছেন। লেখক বলেন , যুক্তি তো সবাই ব্যাবহার করে , তার নিজের মতামত ধোপে টেকানোর জন্য।কিন্তু সেক্ষেত্রে দেখতে হবে তা কতটা কুর’আন ও সুন্নাহ আকারে হচ্ছে, কারণ যুক্তি আসে কল্পনা থেকে, যা আপেক্ষিক আর ব্যাক্তিগত; অন্যাদিকে কুর’আন ,সুন্নাহ সন্দেহাতীতভাবে সত্য।
 
 
মন্তব্যঃ-
 
একথা বলতে পারি , এই বই বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক গুরুত্বপুর্ণ, কারণ মানুষ শব্দের ব্যবহারের নামে অপব্যবহার করছে। ভালো কথার আড়ালে খারাপ উদ্দেশ্যে কাজ করছে। যদিও বইটি সর্বপ্রথম প্রকাশ হয় ১৯৯১ সালে , এই বইটির প্রতিটি তথ্য ও ব্যাখ্যা যুগের উদ্দেশ্য সাধনে সক্ষম।রম্য ধরণের রচনা হওয়ায় পড়তে একটুও বিরক্ত লাগবে না। অবশ্যপাঠ্যের তালিকায় জায়গা করে নেয়ার মত একটি বই।